ভারতের শাসন বিভাগ

ভারতের শাসনবিভাগ

ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। এর অর্থ ভারতে দু'ধরণের শাসনব্যবস্থা রয়েছে, একটি হল কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং অপরটি আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থা। আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থা বলতে বোঝায় ২৯টি রাজ্য এবং ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের শাসনব্যবস্থাকে।

কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগ

ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগের অন্তর্গত রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীপরিষদ।  তবে এঁরা প্রত্যেকেই শাসনবিভাগের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং কার্যকাল সীমিত। শাসনবিভাগের স্থায়ী অংশটি হল আমলাতন্ত্র।

রাষ্ট্রপতি

সংবিধানের ৫৩(১)নং ধারা অনুসারে ভারতের শাসনবিভাগের প্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি; তিনি নিজে অথবা অধস্তন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। 
ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ 
নির্বাচন- কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য আইনসভার নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা গঠিত একটি নির্বাচনীমন্ডলীর দ্বারা পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
কার্যকাল- ৫ বছর। উল্লেখ্য, একজন ব্যক্তি কতবার ভারতের রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন সেবিষয়ে সংবিধানে কিছু উল্লেখ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন ব্যক্তি সর্বাধিক ২ বার রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন।
ক্ষমতা- ভারতের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে প্রভূত শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- তিনি অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির লেফটেনেন্ট গভর্নরগণকে নিয়োগ করেন। এছাড়াও তিনি কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান, নির্বাচন কমিশনার সহ সকল উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়োগ করে থাকেন।

উপরাষ্ট্রপতি

সংবিধানের ৬৩ নং ধারা অনুসারে, ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছেন ভারতের উপরাষ্ট্রপতি। 
ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ডঃ সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণান 
নির্বাচন- রাষ্ট্রপতির মতো উপরাষ্ট্রপতিও পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।
কার্যকাল-  ৫ বছর।
ভূমিকা- উপরাষ্ট্রপতি সংসদের উচ্চকক্ষ অর্থাৎ রাজ্যসভায় সভাপতিত্ব করেন। কোনো কারণে রাষ্ট্রপতির পদশূন্য হলে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতির ভূমিকা পালন করে থাকেন।

প্রধানমন্ত্রী

সংবিধানের ৭৪(১) নং ধরা অনুসারে, রাষ্ট্রপতিকে সহযোগিতা এবং পরামর্শ দেবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রী পরিষদ থাকবে। প্রধানমন্ত্রীই হলেন ভারত রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রধান। ভারতের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারনে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা  সবথেকে বেশি।
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু

আমলাতন্ত্র

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যে সকল কর্মীগণ শাসনবিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে নিযুক্ত হন তাদেরকেই আমলা বলা হয়। আমলাতন্ত্র হল শাসনবিভাগের স্থায়ী অংশ। এই আমলারাই প্রকৃতপক্ষে শাসনবিভাগের বিভিন্ন নীতি কার্যকর করে থাকেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার ক্যাবিনেট সচিব হলেন ভারতের সবথেকে উচ্চপদস্থ আমলা।

কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগের কয়েকজন আধিকারিক
অ্যাটর্নি জেনারেল- ভারত সরকারের প্রধান আইনি উপদেষ্টা হলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। সংবিধানের ৭৬(১) নং ধারা অনুসারে ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁকে নিয়োগ করেন। 
সলিসিটর জেনারেল- অ্যাটর্নি জেনারেলের অধস্তন পদাধিকারী হলেন সলিসিটর জেনারেল। সলিসিটর জেনারেলের পদটি সংবিধানে উল্লেখ নেই। ক্যাবিনেটের নিয়োগ কমিটি কর্তৃক তিনি নিযুক্ত হন। 
অডিটর এন্ড কম্পট্রোলার জেনারেল- ভারত সরকারের প্রধান হিসাব রক্ষক হলেন অডিটর অ্যান্ড কম্পট্রোলার জেনারেল। সংবিধানের ১৪৮ নং ধারা অনুসারে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে রাষ্ট্রপতি তাঁকে নিয়োগ করেন। 
নির্বাচন কমিশনার- ভারতের নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন রয়েছে (ধারা ৩২৪)। নির্বাচন কমিশনের প্রধান আধিকারিক হলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন। 

ভারতের আঞ্চলিক শাসনবিভাগ

ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ২৯টি রাজ্য এবং ৭টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে। রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির শাসনতন্ত্র ভিন্ন প্রকৃতির। রাজ্যগুলির শাসনবিভাগের সর্বময় কর্তা হলেন রাজ্যপাল। রাজ্যপালকে পরামর্শ দেবার জন্য রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির শাসনব্যবস্থা অনেকটাই দেন্দ্র সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির প্রধানকে বলা হয় লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। এঁদের নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। ভারতের সাতটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে দিল্লি এবং পদুচেরিতে বিধানসভা রয়েছে এবং একজন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন।
 দিল্লি এবং পুদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও বিধানসভা রয়েছে। 
রাজ্যপাল
সংবিধানের ১৫৩ নং ধারা অনুসারে "প্রতিটি রাজ্যের জন্য একজন করে রাজ্যপাল থাকবেন"। যদিও একজন রাজ্যপাল একাধিক রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারেন। রাজ্যপাল হলেন রাজ্যগুলিতে নিযুক্ত রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি। ১৫৪(১) নং ধারা অনুসারে, রাজ্যের সমস্ত ক্ষমতা রাজ্যপালের হাতে ন্যস্ত থাকে। রাজ্যপাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন।

মুখ্যমন্ত্রী 

সংবিধানের ১৬৩(১) নং ধারা অনুসারে রাজ্যপালকে সহায়তা এবং পরামর্শদান করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ  থাকার উল্লেখ রয়েছে। তত্ত্বগতভাবে রাজ্যপাল হলেন রাজ্যের শাসনতান্ত্রিক প্রধান কিন্তু বাস্তবে রাজ্যের প্রকৃত শাসক মুখ্যমন্ত্রী। 

অ্যাডভোকেট জেনারেল

সংবিধানের ১৬৫(১) ধারা অনুসারে, "প্রত্যেক রাজ্যের রাজ্যপাল হাইকোর্টের বিচারপতি হবার যোগ্য এমন একজনকে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসেবে নিয়োগ করবেন"। অ্যাডভোকেট জেনারেল হলেন রাজ্য সরকারের প্রধান আইনি উপদেষ্টা।

মুখ্যসচিব 

মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রিগণ হলেন জনপ্রতিনিধি এবং তারা শাসনবিভাগের অস্থায়ী কর্মী। এইজন্য কেন্দ্রের মতো রাজ্যের শাসনবিভাগেও একটি স্থায়ী অংশ রয়েছে যা রাজ্যসরকারের নীতি নির্ধারণ এবং রূপায়ণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন। রাজ্যপ্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন বিভাগে বিবিধ দায়িত্ব পালন করেন। রাজ্যের প্রধানতম আধিকারিক হলেন মুখ্য সচিব।