কয়েকটি প্রাচীন সভ্যতা

প্রাচীন সভ্যতাসমূহ
ইতিহাসের আলোচনায় সভ্যতা বলতে বোঝায় এমন একটি উন্নত সমাজব্যবস্থা যেখানে কৃষি, শ্রমের বিভাজন, সুসংবদ্ধ রীতিনীতি/ ধর্ম, কিছু বিজ্ঞান/  প্রযুক্তি, একটি নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থা এবং একটি লিখিত ভাষা/ লিখন পদ্ধতি বর্তমান ছিল। সাধারণত কোনো নদীকে কেন্দ্র করে এইসব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। তবে সভ্যতা গড়ে ওঠার কয়েক লক্ষ বছর আগে থেকেই পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল। সভ্যতার বিকাশ হয়েছে অনেক পরে।
প্রাচীন সভ্যতাসমূহ

১) মেসোপটেমিয়া

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন মেসোপটেমিয়া হল প্রাচীনতম সভ্যতা। মেসোপটেমিয়া কথাটির অর্থ হল দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল।
মেসোপটেমিয়ার ধ্বংসাবশেষ 
কোথায়-টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে।
বর্তমানে কোথায়-ইরাক।
অবদান/ কীর্তি- মেসোপটেমিয়ার মানুষ প্রথম চাকা আবিষ্কার করেছিল।
ভাষা/ লিপি- প্রথমে তারা চিত্রলিপির দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতো, পরে কিউনিফর্ম লিপি উদ্ভাবন করেছিল।

২) প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা

প্রাচীন মিশরে এক সুসংহত শাসনব্যবস্থা বর্তমান ছিল যা আজকের দিনেও দৃষ্টান্তস্বরূপ। প্রাচীন মিশরীয় শিল্প ও স্থাপত্য আজও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে,
মিশরের পিরামিড যা আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে 
কোথায়- নীল নদের তীরে।
বর্তমানে কোথায়- মিশর।
অবদান/ কীর্তি-মিশরের পিরামিড যা আজকের প্রযুক্তিবিদদেরও বিস্মিত করে।
ভাষা/ লিপি-মিশরীয়দের লিপির নাম হিয়েরোগ্লিফিক।

৩) সিন্ধু সভ্যতা

প্রাচীন ভারতের প্রথম নগর সভ্যতা সিন্ধু নদীকে কেন্দ্র করে বিকাশ লাভ করেছিল। সেইজন্য এর নাম সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পা সভ্যতার অনেকগুলি কেন্দ্রের মধ্যে প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল হরপ্পা। সেইজন্য এই সভ্যতাকে হরপ্পা সভ্যতাও বলা হয়। অপর একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হল মহেঞ্জোদাড়ো (অর্থাৎ মৃতের স্তুপ)। ১৯২১ সালে হরপ্পা সভ্যতা আবিষ্কার করেন দয়ারাম সাহানি, জন হুবার্ট মার্শাল এবং মাধো স্বরূপ ভাটস। যদিও হরপ্পা সভ্যতার খোঁজ শুরু হয়েছিল বহু আগেই। মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা আবিষ্কার করেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯২২ সালে)।
প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ 
কোথায়- সিন্ধু নদীর তীরে।
বর্তমানে কোথায়- বর্তমান ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত।
অবদান/কীর্তি- সিন্ধু সভ্যতা ছিল নগরসভ্যতা। একটি বৃহৎ স্নানাগার এবং শস্যাগার- এই সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন।
ভাষা/ লিপি- সিন্ধু সভ্যতার লিপির নাম সিন্ধু লিপি যা এখনো পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। এইজন্য এই সভ্যতার অনেক কথা জানা যায়নি।

৪) প্রাচীন চীন সভ্যতা

খ্রিস্টপূর্ব যুগে চীনে যে সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল বর্তমানে চীন সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
চীনের প্রাচিরের একটি অংশ 
কোথায়- হোয়াং হো নদীকে কেন্দ্র করে প্রাচীন চীন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
বর্তমানে কোথায়- চীন।
অবদান/কীর্তি- কাগজ এবং রেশম আবিষ্কার।
ভাষা/ লিপি- চীনা লিপি।

৫) মায়া সভ্যতা

প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে সবথেকে রহস্যজনক সভ্যতাটি হল মায়া সভ্যতা। এটি একটি মেসো-আমেরিকান সভ্যতা (মেসো-আমেরিকান বলতে মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকাকে বোঝানো হত)। প্রাচীন মায়া সভ্যতার সূচনা ১৮০০ খ্রীঃ পূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে হলেও ২৫০ খ্রীঃ থেকে ৯০০ খ্রীঃ পর্যন্ত সময়কে মায়া সভ্যতা উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল।
মায়া সভ্যতার অংশবিশেষ 

কোথায়- মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকা।
বর্তমানে কোথায়- মেক্সিকোর চিয়াপাস, টাবাস্কো প্রদেশ এবং গুয়াতেমালা, বেলিজ, হন্ডুরাস এবং এল সালভাদোর।
অবদান/ কীর্তি- মায়া সভ্যতার মানুষদের সবথেকে বড় কীর্তি ক্যালেন্ডার তৈরি।
ভাষা/ লিপি- মায়া সভ্যতার ভাষা ছিল অ্যাজটেক। মায়া সভ্যতার লিপি ছিল হিয়েরোগ্লিফিক।

৬) ইনকা সভ্যতা

ইনকা সভ্যতা অপেক্ষাকৃত নবীন হলেও কয়েকটি কারণে এই সভ্যতা উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, এটি ছিল প্রাক-কলম্বীয় যুগের (কলম্বাসের আমেরিকায় আগমণের পূর্বে) বৃহত্তম সভ্যতা। দ্বিতীয়ত, তাদের স্থাপত্যশিল্প-যোগাযোগ ব্যবস্থা-বস্ত্রবয়ন প্রভৃতি আজকের দিনের মানুষকেও আকৃষ্ট করে।
প্রাচিন ইনকা সভ্যতা 
কোথায়- দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, মুলত আন্দিজ পর্বতমালাকে কেন্দ্র করে।
বর্তমানে কোথায়- পেরু, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা এবং চিলির অংশবিশেষ।
অবদান/ কীর্তি- সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য মাচু-পিচু
ভাষা/ লিপি- ইনকা সভ্যতার ভাষা ছিল কিচুয়া। তারা গণনা করার জন্য বা মনে রাখার জন্য দড়িতে গিঁঠ বেঁধে রাখত, এই পদ্ধতিকে বলা হত কুইপু।
প্রাচীন সভ্যতার এই তালিকাটি সংক্ষিপ্ত। এই ছ'টি সভ্যতা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আরো অনেক সভ্যতা বিকাশলাভ করেছিল যাদের মধ্যে প্রাচীন ক্রীট দ্বীপের মিনোয়ান সভ্যতা, মিসেনিয়ান গ্রীস সভ্যতার নাম করা যেতে পারে।